
ডেস্ক নিউজ।
সাড়ে ৪শ’ বছরের পুরনো মোঘল আমলের স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম এক অনন্য নিদর্শন গোয়ালবাথান মসজিদ। নড়াইল সদর উপজেলার চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের গোয়ালবাথান গ্রামে অবস্থিত মসজিদটি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক পর্যটক দেখতে আসেন মসজিদটি। এটি কত সালে নির্মিত হয়, তা নিয়ে কিছুটা মতপার্থক্য থাকলেও মসজিদটিতে রয়েছে মোগল স্থাপত্য রীতির সুস্পষ্ট ছাপ। প্রচলিত রয়েছে, ‘জিনদের সাহায্যে এক রাতেই’ নির্মিত মসজিদ ‘জিনের মসজিদ’ নামেও পরিচিত। মসজিদের পাশে বিশাল আকারের পুকুরের শান্ত জলরাশির সঙ্গে মসজিদের নান্দনিক সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
স্থানীয়দের ধারণা, মসজিদটি রাতের বেলায় যেকোনো সময় অলৌকিকভাবে নির্মাণ হয়েছে। কারণ, সকালে উঠে মসজিদটি দেখা যায়। প্রায় সাড়ে ৪’শ বছর আগে মোঘল আমলে মুন্সি হয়বৎউল্লাহ নামের এক বুজুর্গ ব্যক্তি কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে ইসলাম ধর্ম প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে আসেন নড়াইলের গোয়ালবাথান গ্রামে। এ গ্রামে এসে জঙ্গলের মধ্যে আস্তানা গাড়েন তিনি। তিনি সাধক ছিলেন। এই অঞ্চল তখন গরু চরানোর চারণ ভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেখানে তিনি রাস্তা তৈরি করে বসতি গড়া শুরু করেন। তিনিই ওই গ্রামের প্রথম বাসিন্দা ছিলেন। একদিন তিনি সঙ্গীদের নিয়ে জঙ্গলের কয়েকটি গাছ কেটে ঘর তৈরির উদ্যোগ নেন। হঠাৎই এক রাতে তিনি স্বপ্নে ‘বাড়ি তৈরি না করে, মসজিদ নির্মাণ কর’ এ রকম নির্দেশনা পান। একই স্বপ্ন তিনি পরপর তিনরাত দেখেন। এই স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন তিনি।

প্রচলিত আছে, জিনদের সাহায্য নিয়ে এক রাতেই অলৌকিক শক্তি দিয়েই এক গম্বুজ মসজিদটি নির্মাণ করেন মুন্সি হয়বৎউল্লাহ। একই সময়ে এলাকার মানুষের সুপেয় পানির জন্য মসজিদ লাগোয়া বিশাল আকৃতির পুকুর খনন করা হয়। প্রাচীন ও ইসলামিক স্থাপত্যনিদর্শন সমৃদ্ধ মসজিদটিতে চারিদিকে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ দ্বারা বনজঙ্গলে ঘেরা। এলাকার লোকেরা হঠাৎ গড়ে ওঠা এই মসজিদ এবং বিশাল আকৃতির পুকুর দেখে অবাক হয়ে যান। এলাকার মুসল্লিরা বিশ্বাস করেন যে, সে সময় জিনেরা এখানে নামাজ পড়ত। মোঘল আমলে তৈরি আশ্চর্য হওয়ার মতো এই মসজিদে সাড়ে ৪শ’ বছর ধরে নিয়মিত ওয়াক্তের নামাজ এবং শুক্রবারে জুমার নামাজ আদায় করা হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদটির অবস্থান নড়াইল জেলা শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে উত্তর-পূর্বদিকে চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের গোয়ালবাথান গ্রামে নীল রংয়ের গোয়ালবাথান জামে মসজিদ। ৫ একর ৭০ শতক জমির ওপর গড়ে উঠেছে মসজিদটি। এর দৈর্ঘ্য ৫০ ফুট ও প্রস্থ ৩৫ ফুট। হাতে তৈরি পাতলা ইট আর চুন-সুড়কির গাঁথুনিতে তৈরি হয় উপরে সুনিপুণ এক গম্বুজ মসজিদ মোগল স্থাপত্যশৈলীর নান্দনিক ছোঁয়া। সুগঠিত ছোট চারটি মিনার আর দেয়ালের অসাধারণ কারু কাজও রয়েছে। বজ্রপাত নিরোধক লোহার দন্ড রয়েছে। কোন পিলার নাই। কোন রড়ের ব্যবহার ছাড়াই মসজিদটি অপূর্ব স্থাপত্য নির্মাণ শৈলী হয়ে আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত মসজিদের ভেতরে গরমের সময় ঠান্ডা ও ঠান্ডার সময় গরম অনুভূত হয়। বিধায় ভেতরে ঢুকলেই প্রশান্তি লাগে। মূল মসজিদের ভেতরে একসঙ্গে তিন কাতারে নামাজ আদায় করা সম্ভব। তবে সময়ের পরিক্রমায় মুসল্লির সংখ্যা ক্রমে বাড়তে থাকায় মসজিদের সঙ্গে নতুন করে একটি অংশ সংযোজন করা হয়েছে, যাতে আরও বেশি মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে ইবাদত করতে পারেন। মসজিদ সংলগ্ন মুন্সি হয়বৎউল্লাহ সাহেবের বংশধরেরা বংশপরম্পায় বসবাস করছেন। সেই পরিবারের সন্তান মুন্সি রহমতউল্লাহ এই মসজিদের ইমামতি করছেন।
তিনি জানান, ‘আমার পূর্বপুরুষদের মুখে শুনেছি, এক গম্বুজ জামে মসজিদটি এক রাতেই নির্মাণ হয়েছে। এখানে একসময় শুক্রবারে বিশাল আকারের জুম্মা নামাজ আদায় হতো। দূর-দূরান্ত থেকে এখানে নামাজ আদায় করতে আসতেন মুসল্লিরা। এখনো নানা বয়সের মানুষ প্রায় ৪৫০ বছর আগে নির্মিত মোঘল আমলের স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন মসজিদটি দেখতে ছুটে আসেন। ধারণা করা হয়, নড়াইলে এটিই সবচেয়ে পুরোনো মসজিদ। এক সময়ে নড়াইলে এবং আশেপাশে কোন মসজিদ না থাকায় পায়ে হাঁটা পথে দূর থেকে হেঁটেও মুসল্লিরা শুক্রবারে জুমার নামাজ আদায় করতে আসতেন এখানে। এখানে ইমামতি করতে পেরে গর্ববোধ করছি। আশা করি এটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ তাদের আওতায় নিয়ে মসজিদটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করবে।’
নড়াইলের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমি শুনেছি মসজিদটি প্রায় সাড়ে ৪শ’ বছর আগে মোঘল আমলের তৈরি। স্থানীয়রা এটিকে জিনের তৈরিও বলে থাকেন। পুরাতন মসজিদ সংরক্ষণে শিগরিই আমাদের প্রকল্প চালু হবে। ইতিমধ্যে আমরা গোয়ালবাথান মসজিদের নাম সম্পৃক্ত করেছি। আশা করছি মসজিদটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।’